Skip to main content

Featured

  নীচে নামতে নামতে অতলে বুক পেতে শুই ,   হৃদপিণ্ড দূরে পড়ে আছে একদিকে। অস্থি-মাংসপিন্ড-রক্ত মিশে মাটির রং তামাটে। আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যায় পুরুষের দল। তাদের মধ্যে কেউ পা দিয়ে পিষে দিয়েছে এক ধারে পড়ে থাকা আমার হৃদপিণ্ড। কখনও মাথার মধ্যে পা রেখেছে কেউ। হাসি মুখে তাকিয়ে দেখেছি সব। মা, দিদিমা, শতাব্দী প্রাচীন মায়েদের ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি। দীর্ঘ দিনের অর্জিত বোধ, শিক্ষা, অর্থ, আত্মাভিমান পা দিয়ে সরিয়ে আমার মুখে হাসি লেগে থাকে।  আমার পাশে পরে থাকা সব মৃতদেহ হাসছে। কখনও পুরুষের দল, কখনও একজন পুরুষ পদাঘাত করেছে বহুবার বহুবার। অথচ ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ হেসেছে মৃদুস্বরে। হাসতে হাসতে শেষবার ভিক্ষা চেয়েছি ঈশ্বরের কাছে, কান্না দাও হা ঈশ্বর কান্না দাও, সব স্থৈর্য, সব সহন, অবশিষ্ট অসীম প্রেম উৎসর্গ করে দিয়ে জানিয়ে এসেছি কাঁদতে দাও আমাদের। পরম বোধে প্রেমহীন করো আমাদের।

দেবদাস নয়

ত্তুরে হাওয়ায় তখন তির তির করে কাঁপছে দেবদারু বন। মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে বয়ে যাওয়া সেবতী নদী। অনিয়ত চলার পথে সে ভেঙেছে বহু হৃদয়ভূমি। তার চিত্রপটে আঁকা হয়েছে মানববসতি। মাঝে মাঝে কম্বলমুড়ি দিয়ে শীতকাতুড়ে দেবদাস এসে বসে তার পাশে। সেই মোহন বাঁশির সুরে একবারের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ায় সেবতী। চন্দ্রমুখীর একটা দুটো পাপড়ি ভাসিয়ে দিয়ে তাকিয়ে থাকে সে, মনপ্রাণ দিয়ে চাওয়া গহীন দিনে একটা পাপড়ি ভেসে যায় তার আরশি জলে। 

সামনে উচ্চমাধ্যমিকের কঠিন গন্ডি, কাঁটার মুকুট মাধ্যমিকে প্রথম দশের শরীক হওয়া। সে মুকুট গেঁথে বসে যায় দেবদাসের মাথায়। রক্তক্ষরণে সেবতীর জলও কখন লাল হয়ে ওঠে। দেবদাস জানেনা, জানেনা সেবতী, জানেনা চন্দ্রমল্লিকার পাপড়ি। একটা, দুটো, তিনটে.... 


আগ্রাসী সন্ধ্যের মুখে আস্তাকুঁড়ে ফিরতে ভয় করে। মরতে বসা সন্ধ্যে-প্রদীপের আলোয় বাবার ছায়া কেমন কাঁপে, পা'টা যেন একটু বেশী। ঠিক কতখানি আলো জ্বাললে দেয়ালে মায়ের ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠত দিদিভাই জানেনা। কোজাগরী ধানে ভাতের থালা ভরে না। তার আগেই টুপটাপ রক্তের ফোঁটা অযাচিতভাবে থালায় এসে পড়ে। দগ্ধ কপাল ভেঙে চৌচির হতে কম সময় লাগে, পদ্মের মতো নরম ঠোঁটের কোণে কালচে আভা ধরেছে। মা মরার পর। একটু একটু করে রোজ। 

ভূতগ্রস্ত দেবদাস। প্রতিদিন যার পাথরে জমা শ্যাওলায় পিছল খেয়ে গড়িয়ে পড়ে সেবতীর জলে, সেবতী বলে, "পৌঁছে দেব, সময়মত, বছর দশেক আগে।" 

কলতলায় বসে বমি করে দেবদাস। নিজের পচাগলা মৃতদেহের গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে। অস্ফুটে বলে,  "দিদি, আজও?" 

হুহু করে কান্না পায় চূর্ণীর। কপালের জমাট বাঁধা রক্ত অন্ধকারে জ্বলে ওঠে। বিশ্রী ক্ষত।

শিউলিতলায় মায়ের লাশ পড়েছিল সেদিন, অনেকক্ষণ। সিঁদুর মাখামাখি। সেদিন থেকে দেবদাস জানে শুকতারার রঙ লাল। জানে ধ্রুবতারা খসে গেলে চোখ বুজে চাইবে,

.... 

রাত জাগে দেবদাসের সাথে। চূর্ণীর চোখ বুজে আসে অন্যদিনের চেয়ে বেশী। অনেক অনেক বেশী। 

"এই গালটা খেয়েনে দিদি, তারপর আমার কোলে মাথা রেখে শো একটু।" 

"একটা গান শোনাবি ভাই? মা'র কাছে যাব। মা'র কাছে যাব, মা'র কাছে...." 


তুই ফিরে এলে, ওরে চঞ্চল
আবার ফুটিবে বন ফুল–দল
ধূসর আকাশ হইবে সুনীল
তোর চোখের চাওয়ায়।
শূন্য এ–বুকে পাখি মোর
আয় ফিরে আয় ফিরে আয়---


চূর্ণী ঘুমিয়ে পড়লে দেবদাস ওঠে নিঃশব্দ পায়ে। বাবা ঘুমিয়ে আছে। প্রচন্ড শব্দে থেঁতলে যায় আরও দুই শব্দ "খানকীর ছেলে"। চূর্ণীর পাশে এসে বসে দেবদাস। ঘুমোচ্ছে দিদি। অঘোরে। দেবদাস গোনে হাতের মুঠো একটু খুলে, ষোলো সতেরো, আঠেরো,....

চূর্ণী ঘুম থেকে উঠবে, যেদিন বৃষ্টি পড়বে অবিশ্রাম। যেদিন মেঘমল্লারে কেঁদে উঠবে সেবতী, যেদিন রুদ্রভৈরবী শুনে ধেয়ে আসবে শৈলজা সেবতীর মোহনায়। 

নোনা জল নিজের গতিপথ বেছে নেয়। চোখের ওপর দিয়ে, ঠোঁটের কোণে? কিন্তু এ নোনা জলের মোহনা কোথায় আছে?

মোহনার কাছে শৈলজা আছে, সেবতী আছে। চন্দ্রমুখীর একটা দুটো পাপড়ি। আর পাথরের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে দেখা যায় দেবদাস। লাল চন্দন মাখা। ধ্রুবতারা খসে পড়ে মোহনার কাছে।

Comments